শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

চাঁদাবাজি কি থামবে না?

অ্যাডভোকেট তোফাজ্জল বিন আমীন
à§« আগস্ট ছাত্র জনতার গণবিপ্লবে স্বৈরাচারের পতন হওয়ার পর নিষ্ঠুর নিপীড়ন, গুম, খুন, অপহরণ ও আয়না ঘরের বিভীষিকা থেকে মুক্তি পায় মানুষ। ঠিক সেময় দেশের স্বার্থে জাতির স্বার্থে দেশের দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নেন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। স্বস্তি ফিরে আসে দেশে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের দোসররা ছাত্র-জনতার গণবিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াসে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা বাস্তবায়নে লিপ্ত। ফলে তারা কখনো গুজব ছড়িয়ে, কখনো জুডিসিয়াল ক্যু করার ষড়যন্ত্রে, কখনো আনসার সেজে, কখনো রিকশা চালক সেজে, কখনো গার্মেন্টস কর্মী সেজে, কখনো বিদ্যুতের কর্মচারী সেজে, কখনো আমলা সেজে, কখনো আগুন লাগিয়ে, কখনো রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম লাগিয়ে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। অপরদিকে আওয়ামী সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে যেসব রাজনৈতিক দল লড়াই সংগ্রাম করেছে তাদের কিছু অংশের নেতাকর্মীরা এখন চাঁদাবাজির মতো অপকর্মে নিজেদেরকে জড়িয়ে দলের ইমেজকে ক্ষুণ্ন করছে যা সত্যিই বেদনাদায়ক। ‘‘অবস্থাটা এমন একলোক চোরের ভয়ে পথ পরিবর্তন করে ভিন্ন পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তখন ডাকাতদল তাকে আক্রমণ করেছে। আমাদের অবস্থাও তা-ই হয়েছে।’’ বাংলাদেশের মানুষ যখন বিএনপিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে তখন বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর চাঁদাবাজির খবর পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হচ্ছে। ফলে ক্ষমতার পট পরিবর্তন হলেও চাঁদাবাজমুক্ত হতে পারেনি বাংলাদেশ।
ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন হওয়ার পর জনগণ আশায় বুক বেঁধেছিল যে, এবার হয়ত চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশে স্বস্তির নিঃশ্বাসটুকু নেয়া যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য দেশ চাঁদাবাজমুক্ত হয়নি; বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে যদি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের মতোই চাঁদাবাজি চলে তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? আর নালিশ করবে কার কাছে? ফ্যাসিস্ট বিতাড়িত হলেও চাঁদাবাজি কেন বন্ধ হচ্ছে না, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার। আগে চাঁদা নিত রতি-মদু-যদু। আর এখন নেয় পদু-গদু। পার্থক্য শুধু নামের। সাধারণ মানুষের মনের আগুন গুলী দিয়েও নেভানো যায় না; যার জ¦à¦²à¦¨à§à¦¤ প্রমাণ জুলাই-আগস্ট বিপ্লব। ফ্যাসিস্ট পালানোর পর কয়েকদিন চাঁদাবাজি বন্ধ ছিল। কিন্তু দিন কয়েক পর একই কায়দায় চাঁদাবাজি চলছে। খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ‘‘সম্প্রতি চাঁদাবাজি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন-আগামীতে যারা ক্ষমতায় যাবেন, তাদের অনেকেই নির্বাচনের জন্য চাঁদাবাজি করছেন। একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সময়ে সময়ে দু-একজনকে বহিষ্কার করতে দেখা যাচ্ছে। নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি করতে গিয়ে দাবি করছেন, গত à§§à§« বছরে তারা ক্ষমতায় ছিলেন না, আর নির্বাচনে অংশ নিতে তাদের টাকার প্রয়োজন।’’ চাঁদাবাজদের লাগাম ধরে রাখতে না পারলে ছাত্র জনতার রক্তের সাথে বেঈমানী করা হবে। সুতরাং জরুরি ভিত্তিতে চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়া প্রয়োজন। এটা করতে না পারলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ইমেজ হাসিনা সরকারের চাইতে বেশি খারাপ হতে পারে।
চাঁদাবাজি করে, দখল ও পেশিশক্তির ব্যবহার করে, মানুষকে জিম্মি করে টাকা পয়সা লুট করা ডাকাতির মতোই অপরাধ। ইসলামও চাঁদাবাজিকে সমর্থন করে না। সুতরাং চাঁদা উত্তোলনকারী, চাঁদা লেখক ও চাঁদা গ্রহণকারী সবাই অপরাধের ভাগিদার। ‘‘মহাগ্রন্থ আল কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ কোরো না এবং এ উদ্দেশ্যে বিচারকের কাছে এমন কোনো মামলা কোরো না যে, মানুষের সম্পদ থেকে কোনো অংশ জেনেশুনে গ্রাস করার গুনাহে লিপ্ত হবে।’ (সুরা: বাকারা, আয়াত:১৮৮)
আল্লাহ তাআলা বলেন-শুধু তাদের বিরুদ্ধেই (শাস্তির) ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ আচরণ করে বেড়ায়। বস্তুত তাদের জন্য আছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (সুরা শুরা, আয়াত: ৪২)
রাসুল (সা.) বলেন, কোনো মুসলমানের সম্পদ তার আন্তরিক সম্মতি ছাড়া হস্তগত করলে তা হালাল হবে না। (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস: ১৬৭৫৬)
হাদিসে কুদসিতে নবীজী ঘোষণা করেন, আল্লাহতাআলা বলেন, হে আমরা বান্দারা! আমি আমার নিজের জন্যে জুলুম করা হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও জুলুম হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা একজন অন্যজনের উপর জুলুম করো না।’ (মুসলিম, তিরমিজি) আমাদের সবারই মনে রাখা দরকার জোর করে কিংবা ভয় দেখিয়ে কারও কাছ থেকে চাঁদা উত্তোলন করাও এক প্রকার জুলুম। অথচ আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে কিছু মানুষ চাঁদাবাজি ও দখলবাজি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছে।
জুলাই আগস্ট বিপ্লবের পরে মানুষ শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলেও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। মহাসড়ক থেকে শুরু করে টার্মিনাল, ফেরিঘাট, নগরীর প্রবেশ পথ, শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক এলাকা, বাস-রেল, নৌ টার্মিনাল, সিএনজি স্ট্যান্ড, বালুমহাল, হাটবাজার, ফুটপাত সবখানে চাঁদাবাজি চলে। কিন্তু দেখার কেউ নেই। চাঁদাবাজরা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। সবসময় ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকে। হাসিনা সরকারের শাসনামলে যারা চাঁদাবাজি করতো তারা হয়ত এখন তেমন সক্রিয় নয়; কিন্তু তাদের শূন্য আসন পূর্ণ হতে সময় লাগেনি। তারাই নতুন চাঁদাবাজদের রুটগুলো পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ফলে কোন কোন এলাকায় মিলেমিশে চাঁদাবাজি চলছে। কোথাও প্রকাশ্যে কোথাও অপ্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চললেও কার্যকর প্রতিরোধ দেখা যায়নি। পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন কেবল ইঁদুল বিড়াল খেলা হয়। ওই পর্যন্তই শেষ! অথচ চাঁদাবাজির কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে তো বাড়ছে! এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে দ্রব্যমূল্যের ছাপ। টিসিবির ট্রাকের লাইনের দিকে তাকালেই বুঝা যায় দ্রব্যমূল্যের দাম নাগালের বাইরে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, ঢাকা শহরে চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, চাঁদাবাজি করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। চাঁদাবাজির কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের দুর্ভোগ হচ্ছে। ফুটপাত হকারদের বিষয়ে তিনি বলেছেন, হকারদের কাছ থেকেও কাউকে চাঁদা দেয়া যাবে না। (যুগান্তর ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪) ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কত ধরনের চাঁদাবাজ যে সৃষ্টি হয়েছে তা খোদ অর্থ উপদেষ্টা নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, বাজারে গেলে দুই-তিন ধরনের চাঁদাবাজ দেখা যায়। এদের ভেতর কিছু (চাঁদাবাজ) আগের সরকারের, কিছু লোক ভবিষ্যৎ সরকারের আর কিছু লোক স্থানীয়। তারা পরস্পর সমঝোতা করে চাঁদাবাজি করে। আইন থাকা সত্ত্বেও চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না। ১৮৬০ সালের দন্ডবিধির ৩৮৫ থেকে ৩৮৮ ধারা অনুসারে চাঁদাবাজি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ৩৮৬ ধারায় বলা হয়েছে- যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুর ভয়ে বা সেই ব্যক্তিকে বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে গুরুতর আঘাতের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করে, সে যে কোনো বর্ণনার কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন যা দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং জরিমানাযোগ্য হবে। দেশের রাজনীতির গতিপথ যখন গণতন্ত্রের পথে হাটে তখন সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু যখন রাজনীতিতে অবক্ষয় দেখা দেয় তখন সেখানে হাজারো অপরাধ উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। সারাদেশের কথা না হয় বাদই দিলাম। রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সামনে প্রতি শুক্রবার হলিডে মার্কেট বসে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্ধ হবে না। এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। প্রয়োজন চাঁদাবাজির রুট বন্ধ করা। তা না হলে মানুষের মনের ভেতর ক্ষোভ বাড়বে। সুতরাং দেশ ও জাতির স্বার্থে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ